চাঁদপুর সকাল

মা বাবার সেবা বয়ে আনে ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা ও সৌভাগ্য

৬ মাস আগে
মা বাবার সেবা বয়ে আনে ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা ও সৌভাগ্য
সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের ভালোবাসার একটি গল্প সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের ভালোবাসা কেমন হয় তার একটি গল্প বলি। হাদীসের গল্প। আম্মাজান আয়েশা রা বলেন, একদিন আমার নিকট একজন ভিক্ষুক নারী এলেন। সাথে ছিল তার দু’টি কন্যা সন্তান। তাকে আমি তিনটি খেজুর দিলাম। তিনি খেজুর তিনটি থেকে দু’টি দুই মেয়েকে দিলেন। আরেকটি নিজে খাওয়ার জন্য মুখের কাছে নিলেন। এমতাবস্থায় সেই একটি খেজুরও মেয়েরা খেতে চাইল। আর অমনি সেই খেজুরটিকে তিনি দুই ভাগ করে দুই মেয়ের মুখে উঠিয়ে দিলেন। আয়েশা রা বলেন, এ ঘটনা আমাকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিল। ফলে ঘটনাটি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বললাম। সব শুনে তিনি বললেন, নিশ্চয় এই খজুরের বদলায় আল্লাহ তাআলা এই মা এর জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন। অথবা তিনি বলেছেন, নিশ্চয় এই খেজুরের বদলায় আল্লাহ এই মাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। [মুসলিম, হাদীস: ২৬৩০] সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দরদ ও ভালোবাসা এমনই হয়।


কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অবহেলা, অজ্ঞতা এবং ধর্মের প্রতি অনুরাগ হ্রাস পাওয়ায় বাবা-মা সন্তান-সন্ততির কাছে চরমভাবে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। যে সন্তান বাবা-মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারতো না, যে বাবা-মাই ছিল এক সময়কার সকল কিছুর ভরসা ও আশ্রয়স্থল, সেই বাবা-মাকেই তারা আজ উটকো ঝামেলা মনে করছে! ফলে তাঁদেরকে রেখে আসছে বৃদ্ধাশ্রমে বা বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে অবলীলায়। কিংবা অবহেলা ও দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে যে, তারা নিজেরাই বাধ্য হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাচ্ছে অথবা নিজের বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। ঠুনকো ঠুনকো অজুহাতে জন্মদাতা বাবা-মা এর সাথে চরম দূর্ব্যবহার করছে কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ফলে পরিবার ও সন্তান-সন্ততি থাকা সত্তেও তারা কষ্টের পাথর বুকে চেপে নিদারুণ জীবন যাপন করছেন। একজন মা বা বাবার পক্ষে এরচে’ বড় দঃখ আর কি হতে পারে? বিভিন্ন সময়ই বৃদ্ধাশ্রম থেকে সন্তানদের কাছে লেখা বৃদ্ধ বাবা-মার চিঠি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। যা পড়ে চোখের পানি সংবরণ করা যায় না। একজন দু’জন নয়, অসংখ্য বাবা-মা প্রতিদিন চোখের জলে বুক ভাসিয়ে যাচ্ছেন। আর অপেক্ষা করছেন কাফনের কাপড়ের জন্য। আজকে আমরা যারা বাবা-মাকে অবহেলা করছি, তাদেরকে ‘খুব ভারী বোঝা’ মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রেখেছি কিংবা তাদের সাথে দূর্ব্যবহার করছি, তারা কি একবারো ভেবে দেখেছি আজ তারা বৃদ্ধ। একদিন আমরাও বৃদ্ধ হবো। তখন আমাদেরও যদি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়, তাহলে কেমন হবে? আরও ভাবা দরকার, আজ তারা বৃদ্ধ। তারা তো পৃথিবীতে বৃদ্ধ হয়ে আসেননি। তারা তো পরিবারের বোঝা ছিলেন না; বরং আমরা সন্তানরাই তো তাদের বোঝা ছিলাম। তারা তো কখনো আমাদেরকে বোঝা মনে করেননি; বরং পরম আদরে বুকে টেনে নিয়েছেন। আগলিয়ে রেখেছেন পরম যতেœ। গর্ভধারণ, প্রসব, স্তন্যদান, ভেজা কাপরে রাত কাটানো ইত্যাদি কি সীমাহীন কষ্ট মা সহ্য করেছেন, তা কি ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব? পৃথিবীর সকল মায়েরাই এ কষ্টগুলো সহ্য করে থাকেন।


আল কুরআনে মা বাবার সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ : আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। কারণ তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সয়ে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’ বছরে। [আমি আরো নির্দেশ দিয়েছি] তুমি কৃতজ্ঞ হও আমার ও তোমার মা-বাবার প্রতি। অবশেষে আমার নিকটই ফিরে আসতে হবে। আর মা-বাবা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কোনো কিছু শরীক করতে চাপ প্রয়োগ করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তুমি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তুমি তার পথই অনুসরণ করবে যে আমার অভিমুখী হয়।’ [ সূরা লুকমান:১৪-১৫]


মা-বাবা কাফের হলেও তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে : বর্ণিত আয়াতের ‘দুনিয়াতে তুমি তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে’ এই অংশটুকু প্রমাণ করে যে, মা-বাবা কাফের হলেও দুনিয়াতে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহর অবাধ্যতা হয়, এমন ক্ষেত্রে তাদের কথা মানা না গেলেও অন্য সকল ক্ষেত্রেই তাদের সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে। তাদের সাথে বেআদবী ও অশালীন আচার-আচরণ করা যাবে না। তাদের মনোবেদনার উদ্রেক হয়, এমন কোনো কাজ করা যাবে না।


বাবা-মায়ের সেবা-যতœ ও আনুগত্য কোনো সময় ও বয়সের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয় : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার কর। মা-বাবার কোনোও একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে কথা বল এবং তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজেকে বিনয়াবনত কর এবং এই দুআ কর, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি দয়া করুন।’ [ বনী ইসরাঈল: ২৩-২৪] উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসিসরীনে কিরাম লিখেছেন- বাবা-মার সেবা-যতœ ও আনুগত্য কোনো সময় ও বয়সের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সব বয়সেই এবং সর্বাবস্থায় মা-বাবার সেবা-যতœ, আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা ফরজ। তবে মা-বাবা বার্ধক্যে উপনীত হলে সন্তানের খেদমত ও সেবা-যতেœর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং তাদের জীবন নির্বাহ সন্তানের দয়া ও কৃপার উপর পুরোপুরি নির্ভশীল হয়ে পড়ে। অপরদিকে বার্ধক্যের উপসর্গসমূহ স্বভাবগতভাবেই মানুষকে খিটখিটে করে দেয়। তৃতীয়য়তঃ বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে বুদ্ধি-বিবেচনাও যখন অকেজো হয়ে পড়ে, তখন তাদের বাসনা ও দাবী-দাওয়াও এমনি হয়ে যায়, যা পূর্ণ করা সন্তানের পক্ষে কঠিন হয়। এহেন অবস্থায়ও তাদেরকে উহ্ বলা বা বিরক্তি প্রকাশ পায় এমন কোনো শব্দ উচ্চারণ কিংবা বিরক্তিবোধক দীর্ঘশ^াস ছাড়াও নিষেধ। [মাআরিফুল কুরআন: ৪৫৮-৪৫৯] যেই বাবা-মায়ের আচার-আচরণে কষ্ট পেয়ে বিরক্তিবোধক দীর্ঘশ^াস ছাড়াও হারাম ও নিষেধ, সেই বাবা-মাকে ঠুনকো অজুহাতে বার্ধক্যে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া কিংবা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়াটা যে কতবড় ভয়ানক গুনাহ তা সহজেই অনুমেয়।


ফিরে যাও, তাদের মুখে হাসি ফুটাও : এক সাহাবীর ঘটনা। তিনি রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, আমি আপনার নিকট দু’টি বিষয়ে বাইয়াত গ্রহণ করতে এসেছি। প্রথমটি হলো হিজরত। দ্বিতীয়টি হলো জিহাদ। আমি আপনার সাথে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে চাই, যাতে সওয়াব লাভ করতে পারি। রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন? সাহাবী উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, তারা উভয়ই জীবিত আছেন। তখন রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি সত্যিই সওয়াব চাও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি সওয়াব চাই। তখন রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে তুমি মাতা-পিতার কাছে ফিরে যাও এবং তাদের খেদমত করো। তাদের খিদমত করে যে সওয়াব পাবে, তা জিহাদ করতে গিয়েও তুমি পাবে না। [সহীহ মুসলিম : ২৫৪৯] অপর বর্ণনায় এসেছে, নবীজী সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ফিরে যাও, তাদের মুখে হাসি ফুটাও, যেভাবে তাদের কাঁদিয়েছিলে।

মা-বাবাকে অবহেলা করা এবং তাদের যথাযথ সেবাযতœ না করা ডেকে আনে ধ্বংস : মা-বাবাকে অবহেলা করা এবং তাদের যথাযথ সেবাযতœ না করা ইহকাল ও পরকালে বরবাদী ডেকে আনে। সাহাবী জাবের ইবনে আব্দুল্লাহর বর্ণনায় এক হাদীসে আছে- তিনি বলেন, একদা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেম্বারে আরোহণ করলেন। প্রথম সিড়িতে উঠে বললেন, আমীন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সিড়িতেও উঠে বললেন আমীন। সাহাবাগণ জিজ্ঞাস করলেন, ব্যাপার কি ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এভাবে তিনবার আমীন বললেন? তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যখন মেম্বারের প্রথম সিড়িতে উঠলাম তখন জিবরীল আ. আগমন করে বললেন, সেই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমযান পেয়েও নিজ গুনাহ মাফ করাতে পারলো না। আমি বললাম আমীন। অতপর বললেন, সেই ব্যক্তি ধ্বংস হোক , যে বাবা-মাকে অথবা কোনো একজনকে পেল অথচ তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালো না। অর্থাৎ সে বাবা-মার খিদমত করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না। আমি বললাম আমীন। তৃতীয় বার বললেন, সেই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হলো আর সে আপনার উপর দুরুদ পাঠ করলো না। আমি বললাম আমীন।’ [ আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী, হাদীস: ৬৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ৭৪৫১] জিবরীল আ. এর বদদুআ আর তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমীন বলা, এ দুটো বিষয় লক্ষ্য করলেই বুঝতে বাকী থাকে না যে, বাবা-মার সেবা-যতœ করাটা কত বড় সৌভাগ্যের বিষয়। আর না করাটা ডেকে আনে ধ্বংস।


মা-বাবার বদদোয়ার পরিণাম : বনী ইসরাঈলের এক বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন, নাম ছিল জুরাইজ। তিনি তাঁর ইবাদতখানায় আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন জুরাইজ তাঁর ইবাদতখানায় ইবাদতরত অবস্থায় ছিলেন, তখন তাঁর মা এসে তাঁকে ডাকলেন, হে জুরাইজ! জুরাইজ চিন্তা করলেন যে, আমি কি মায়ের ডাকে সাড়া দেব, নাকি নামায চালিয়ে যাব? শেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি নামায অব্যাহত রাখবেন। তাই মায়ের ডাক উপেক্ষা করে তিনি নামায চালিয়ে গেলেন। অপরদিকে তাঁর মা কিছুটা দুঃখিত হয়ে ফিরে গেলেন। এমন ঘটনা পরবর্তী দুদিনও ঘটল। তৃতীয় দিন জুরাইজের মা রাগ করে আল্লাহর কাছে বদদুয়া করে বসলেন যে, হে আল্লাহ! ব্যভিচারিণীর মুখ না দেখা পর্যন্ত তুমি তাকে মৃত্যু দিও না। মায়ের বদদুয়া কবূল হয়ে যায়। কিছু দিন পর এক নারী তার কাছে এসে কুপ্রস্তাব দিল। জুরাইজ তা অস্বীকার করলেন। হতাশ হয়ে নারীটি এক রাখালের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করল। পরে নারীটি একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিল। সন্তানটি জন্মানোর পর লোকেরা লোকেরা তাকে প্রশ্ন করল, এটি কার সন্তান? সে বলল, এটি জুরাইজের সন্তান। এই কথা শোনার পর, শহরের লোকেরা বিভ্রান্ত হয়ে গেল এবং তারা বিশ্বাস করতে শুর করল যে, জুরাইজ এই নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তাই তারা এসে তার ইবাদতখানাটি ভেঙে দিল। তাকে ধরে নীচে নামিয়ে আনল। তাকে গালি-গালাজ করল। এভাবে লোকেরা তাকে চরমভাবে অপমানিত করল। তখন জুরাইজ অযু করে নামাযে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি নবজাতক শিশুটির কাছে গেলেন এবং শিশুটির পেটে টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে শিশু, তোমার পিতা কে? অলৌকিকভাবে শিশুটি উত্তর দিল, আমার পিতা অমুক রাখাল। এটা শোনার পর, লোকেরা অবাক হয়ে গেল এবং তারা বুঝতে পারল যে, জুরাইজ একদম নির্দোষ ছিল। তারা জুরাইজের কাছে এসে ক্ষমা চাইল এবং তাকে চুমো দিতে লাগল। তারা বলল, আমরা আপনার জন্য একটি সোনায় মোড়া ইবাদতখানা তৈরি করতে চাই। তখন জুরাইজ বললেন, না, আমি সোনার ইবাদতখানা চাই না। মাটির ইবাদতখানা নিয়েই আমি সন্তুষ্ট। সুতরাং মাটি দিয়েই এটি তৈরি করতে পারেন। অবশেষে লোকেরা তা-ই করল। [সহীহ বুখারী : ৩৪৩৬, সহীহ মুসলিম : ২৫৫০] এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, মা-বাবার দোয়া ও বদদোয়া কতটা প্রভাবশালী। যদি কোনো মা ন্যায়সঙ্গত কারণে সন্তানের জন্য বদদোয়া করেন, তবে সে সন্তান নেককার হলেও আল্লাহ তাআলা তা কবুল করতে পারেন।


মায়ের খিদমতের পুরস্কার : ওয়াইস কারনী রহ. নবীজির যুগে জীবিত ছিলেন। তাঁর একান্ত ইচ্ছা ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে সরাসরি মোলাকাত করা। নবীজিকে দেখার সৌভাগ্যই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া। কিন্তু তাঁর মা অসুস্থ ছিলেন, যাঁর সেবা করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। তাই তিনি নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার হৃদয়ের একমাত্র বাসনা আপনার দরবারে হাজির হওয়া। কিন্তু আমার মা অসুস্থ, তাঁকে ফেলে কি আসতে পারি? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে নির্দেশ দিলেন, তুমি আমার সাক্ষাতে এসো না, বরং বাড়িতে থেকে তোমার মায়ের খিদমত করো। তিনি নিজের ইচ্ছাকে কুরবান করে দিলেন। ফলে তিনি সাহাবী হওয়ার মর্যাদা পেলেন না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াইস কারনী রহ.-কে সাহাবী হওয়ার সুযোগের চেয়েও বড় এক কাজ মায়ের খেদমত ব্যস্ত থাকতে বলেছেন। তিনি নিজের আবেগকে দমন করে নবীজির হুকুম পালন করেছেন। ওয়াইস কারনী রহ. নবীজির সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি, কারণ তিনি মায়ের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে এমন পুরস্কার দিলেন, যা বহু সাহাবীও পাননি! কি সেই পুরস্কার? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-কে বলে গিয়েছিলেন, ‘কারন নামক স্থান থেকে এক ব্যক্তি মদিনায় আসবে। যদি তুমি তাকে পাও, তাহলে তার কাছে দোয়া চাইবে, কারণ আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন।’ উমর রাযি. প্রতিদিন অপেক্ষা করতেন।


যখনই ইয়ামানের কোনো কাফেলা মদিনায় আসতো, তিনি ছুটে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, তোমাদের মাঝে কি ওয়াইস করনী আছেন? একদিন সত্যিই তিনি এলেন! হযরত উমর রাযি. তাঁকে দেখে আনন্দিত হলেন এবং নবীজির কথা স্মরণ করে বললেন,‘আমার জন্য দোয়া করুন!’ ওয়াইস কারনী রহ. অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমার দোয়ার জন্য আপনি কেন এত ব্যাকুল?’ হযরত উমর রাযি. উত্তরে বললেন, ‘এটা আমার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নির্দেশ!’ তিনি বলেছেন, আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করেন।’এই কথা শুনে ওয়াইস কারনী রহ. কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখ বেয়ে অঝোরধারায় পানি ঝরতে লাগল। সুবহানাল্লাহ! মায়ের খিদমতের কারণে নবীজির সরাসরি সাক্ষাত থেকে বঞ্চিত হলেও, নবীজির মাধ্যমে দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ তিনি পেয়ে গেলেন! তাও আবার উমর রা. এর মতো সাহাবীকে বলেছেন তাঁর দ্বারা দোয়া করাতে! অন্য এক বর্ণনায় এসেছে- আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এক রাতে আমি ঘুমাচ্ছিলাম এবং স্বপ্নে দেখলাম যে আমি জান্নাতে আছি। তখন আমি একজন কারীর তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনলাম, তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? ফেরেশতারা বললেন, ইনি হারিসাহ ইবনু নু›মান। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন সদাচারণ এমনই হয়, সদাচারণ এমনই হয়। আর হারিসাহ ছিলেন নিজের মায়ের প্রতি অধিক সদাচারণকারী ব্যক্তি। [মুসনাদে আহমদ :২৫১৮২, ইবনে হিববান,৭০১৫] (চলবে)


লেখক: মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া মাখযানুল উলূম, তালতলা, মোমেনশাহী।